আমার বাবা ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। তার নিজের মেজর ছিলো মডার্ন লিটারেচার তথা এলিজাবেথান লিটারেচার। তো সেই সুবাদে শেক্সপিয়রের নাটকগুলো তার ছিলো প্রিয়। আমি ড. সত্যপ্রসাদ সেনগুপ্তের ছোটদের গল্পে শেক্সপিয়র বইটি পড়েই ক্ষান্ত ছিলাম। কম্প্লিট শেক্সপিয়র খুলে তাতে একটাও ছবি পাইনি(:()। তদুপরি ওটা পুরোই আদ্যিকালের ইংরেজি দিয়ে লেখা। যাই হোক, আব্বা আমাকে বিশেষ জ্ঞানদানের লক্ষ্যে প্রায়ই উচ্চমার্গের লোকদের উচ্চমার্গের সাহিত্য এবং উৎকর্ষ সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে চাইতেন এবং এখনও চান। তেমনি, শেক্সপিয়রের জুলিয়াস সিজারের মার্ক এন্টোনির বক্তৃতাটা নাকি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এও বলতেন। কিন্তু আমি তো Classics Illustrated কমিকে জুলিয়াস সিজার পড়েছি। সুতরাং আমার মার্ক এন্টোনি ভালো লাগবে কেনো? তাছাড়া জুলিয়াস সিজারের কাহিনিতে মার্ক এন্টোনি কীভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়? ছেলেবেলার ধারণাই কেন্দ্রিভূত ছিলো বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকা কনসেপ্টে। অর্থাৎ যাকে নিয়ে কাহিনি সে ছাড়া অন্য সবই ফালতুবৎ।
সেই মার্ক এন্টোনি কী করেছে? বিদ্রোহী সভাসদ এবং কাছের বন্ধুরা সবাই মিলে সিজারকে মেরে ফেললেও তার বন্ধু অসাধারণ বাগ্মী এন্টোনি সুকৌশলে একটি অসাধারণ বক্তৃতা করেন। ‘সম্মানিত সুধি, আমাকে আপনাদের কানদুটো একটু ধার দিন। আমি সিজারের প্রসংশার জন্য আসিনি বরং এসেছি তাকে কবর দিতে’। এরপর তার আবেগময় বর্ণনা এমন নাটকীয় মোড় নেয় যে মৃত সিজার বনে যান নায়ক। এবং তার ফল ভোগ করেন মার্ক এন্টোনি।
জিপি অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে বেশি লাভবান পর্যায়ে থাকা সর্ববৃহৎ মোবাইল অপারেটর গ্রামিনফোন প্রতিনিয়তই আমাদের বিরক্ত করে চলেছে। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার পদ্ধতি বদলে দেবার চেষ্টা থেকে শুরু করে জিপি-ইন্টারনেট ব্যবহারকারিদের বাধ্যতামূলকভাবে অল্প রেজুলুশনের ইমেজ দেখতে বাধ্যকরা, কী’না তারা করছেনা। গতকাল আমি ব্লগার গৌতম রায়ের মেইল পেয়ে চমকে গিয়েছিলাম এই শুনে যে, জিপি নাকি ফেসবুক অনুবাদক নিয়োগ দিচ্ছে! এখন থেকে নাকি এই অনুবাদের ফলে মোবাইল থেকেও বাংলায় দেখা যাবে ফেসবুক! কী তেলেসমাতি? অনেকেই এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যেমন হাসিব (http://www.nirpata.com/?p=838) আমি বিস্তারিত তথ্যে যাচ্ছিনা।
বরং আমি একটু মার্ক এন্টোনি হবার চেষ্টা চালাই! প্রথমে একটু খুঁজে দেখি জিপি ফেসবুক অনুবাদের উদ্যোগ নেয়াতে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে:
১.
ছবিটি দেখুন। সক্রিয় অনুবাদকারি ১৭০জন! আমি কস্মিনকালেও এতো অনুবাদক একসাথে দেখিনি! আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকবার ব্লগে ব্লগে লিখে ফেসবুক অনুবাদ করার জন্য অনেককে আহ্বান জানিয়েছি। কখনো অনেকে সাড়া দিয়েছেন কখনো দেননি। সর্বোচ্চ মনে হয়না ৪০জনের বেশি সক্রিয় অনুবাদক কখনো একসঙ্গে দেখেছি। কিন্তু গ্রামিনের অ্যাডটি প্রচার হবার পর থেকে ধুম পড়ে গেছে। দুপুরেও দেখেছিলাম ১১১জন। এরপর বইমেলাতে গেলাম নাসির খান সৈকত এবং তামিম শাহরিয়ার সুবিন এর সাথে ফেসবুক অনুবাদ আর এই গ্রামীনের উদ্যোগের ব্যাপারে আলাপ করতে। কিন্তু ফিরে এসে দেখি ১৭০জন হয়ে গেছে। গ্রামীনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়!
২. জিপি যেভাবে বিজ্ঞাপনটি দিয়েছে। তাতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মাঝে বিপুল সাড়া পড়ে গেছে। দেখুন নিচের স্ক্রিনশটটি:
কী বুঝলেন? কেবলই ফেসবুক অনুবাদ এতে প্রবলভাবে সঞ্চালিত হবে? না, এতে বাংলায় কম্পিউটারে লেখালেখি, অনলাইনে মিথস্ক্রিয়া সবই বেড়ে যাবে।
দেখুন আরেকটি ছবি:
অনেকেই বাংলা কী করে লেখা যাবে। চ্যাটেও বাংলা লেখা যাবে কিনা। এমনকি সবকিছুই বাংলাতে হোক ইত্যাদি নানান কথা নিয়ে আসছেন। তারমানে একটা জোয়ার সৃষ্টি করতে পেরেছেন গ্রামীনফোন। তাদের এই বিজ্ঞাপনের ফলে ফেসবুক ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চর্চা সবার মধ্যে বেড়ে যাবার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাদের বিজ্ঞাপন তৃণমূল পর্যন্ত লোকের কাছে পৌঁছায় সুতরাং এর ইমপ্যাক্ট সর্বব্যাপী হবার কথা।
৩. ফেসবুকের অনুবাদে আগেই অনেকে যুক্ত ছিলেন। আমার ধারণা ২০০৬ বা ২০০৭ থেকেই ফেসবুক বাংলায় অনুবাদ শুরু হয়। আমি নিজেও সেরকম শুরুর দিকেই অনুবাদ অ্যাপ্লিকেশনটি যোগ করে নিয়েছিলাম। যদিও অনুবাদ প্রকৃত অর্থে শুরু করি অনেক অনেক দেরিতে অর্থাৎ অক্টোবর ২০০৮এ এসে। অনেক অনেক সমস্যা পাই আমরা অনুবাদকরা। সেগুলো একা একা ফেসবুককে অবহিত করা এবং সঠিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা। জিপির মতো রাঘব বোয়াল সেই দায়িত্বগুলো কাঁধে নিয়ে প্রকল্পটি যদি এগিয়ে নেয় তাহলে ভালো নয়?
৪. ফেসবুকের ইনলাইন ট্রান্সলেশন বা ইনলাইন রিপোর্টিং একটি অসাধারণ কাজ। ফ্রন্টএন্ডেই ব্যবহারকারি তার ইন্টারফেসের ভাষা নিজের মতো করে নিতে পারবে। ফেসবুকের আগে এই সুবিধা আর কেউ দেয়নি। সুতরাং ফেসবুকের অনুবাদে যুক্ত থেকে বাংলাভাষাকেও সেবা করা হবে। বাংলাভাষাও একটি সচল টেকি পরিমণ্ডলে প্রবেশ করবে বৃহত্তম সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে।
৫. ফেসবুকের বর্তমান বাংলার কোড হচ্ছে bn_IN মানে ইন্ডিয়ান বাংলা! বাংলা এমন একটি ভাষা যার জন্য বাংলাদেশ নামক একটি দেশের জন্ম হয়েছে। সেই ভাষা স্বাতন্ত্র্য জায়গা পাবেনা? যারা আগেই অনুবাদ করছিলেন তার প্রায়শই ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে এই ব্যাপারে জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এখনো সুরাহা হয়নি। যদি জিপি এখানে নিয়ন্ত্রকের ভার নেয় তাহলে এধরণের আব্দার বা দাবী পূরণ করা কোনো সমস্যাই হবার কথা নয়।
৬. ফেসবুকের মাধ্যমে কতো কী করা যায় তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহ-আমির-আর্মিপ্রধানগণ। এমনকি আমাদের ডিজিটাল সরকারও ফেসবুককে ব্যান করে রেখেছিলেন কিছুদিন। এমন শক্তিশালি মাধ্যমকে তো আর মহান গ্রামীনফোন উপেক্ষা করতে পারেন না, তাইনা? তাই এর সমৃদ্ধির সাথে নিজেদের কপাল ঠেঁকিয়ে আরো প্রচার চাইছেন গ্রামীন ফোন। আমি কিন্তু সমস্যা দেখিনা। ব্যবসা মানেই হচ্ছে কম বিনিয়োগে বেশি লাভের চিন্তা। গ্রামীনফোনও তাই করেছেন। ফেসবুকই একমাত্র এবং সর্ববৃহৎ সোস্যাল মিডিয়া যা CrowdSroucing এর মাধ্যমে নিজেদের ভাষা নিজেরাই অনুবাদ করে নিতে দিচ্ছে। যা কিনা গুগল পয়সা দিয়ে করায়। আর তা বেশ দুয়োও পায়। যেমন, জিমেইল বাংলা করে দেখুন অথবা ব্লগস্পটে ঘুরে দেখুন। বাংলার মান দেখলে বিবমিষা হবে। তো এমন বড় সাইটের ক্রাউডসোর্সিংয়ে নিজেদের যুক্ত করলে লাভ ছাড়া তো কোনো ক্ষতি নেই!
বাবা আরেকটা গল্প বলতেন। বলতেন মানে এখনও বলেন। সেটি হচ্ছে, আর্ল অফ চেস্টারফিল্ডের A Letter to his son। ইংরেজ আর্ল সাহেব তার ছেলেকে বলেন। DEAR BOY: There are two sorts of understandings; one of which hinders a man from ever being considerable, and the other commonly makes him ridiculous; I mean the lazy mind, and the trifling, frivolous mind: Yours, I hope, is neither. The lazy mind will not take the trouble of going to the bottom of anything; but, discouraged by the first difficulties (and everything worth knowing or having is attained with some), stops short, contents, itself with easy, and consequently superficial knowledge, and prefers a great degree of ignorance to a small degree of trouble. These people either think, or represent most things as impossible; whereas, few things are so to industry and activity. But difficulties seem to them, impossibilities, or at least they pretend to think them so—by way of excuse for their laziness. An hour’s attention to the same subject is too laborious for them; they take everything in the light in which it first presents itself; never consider, it in all its different views; and, in short, never think it through.
আব্বা আজকাল অবশ্য বলেন না আগে ছোটবেলা যেমন জোরে জোরে মুখস্ত বলতেন। কারণ আমারও মুখস্ত হয়ে গেছে শুনতে শুনতে! কিন্তু আমি বাঁচালের মতো এইসব গল্প ফাঁদছি কেনো? কারণ আছে! কারণগুলো গত দুইদিনের গ্রামীনফোনের ফেসবুক অনুবাদের অসাধ্য সাধন আর বিজ্ঞাপন আর তাদের প্রেস রিলিজের পূর্ণ বিবরণ দেখলেই বুঝবেন।
১. তারা এমন ভাব করছে যেনো ফেসবুক বাংলায় নেই। বাংলায় করতে হবে।
২. ফেসবুক আগে কিছু স্বত:প্রণোদিত গাধারা অনুবাদ করেছেন কিন্তু এখন তেলা মাথায় তেল পড়বে। অর্থাৎ রাজা ফেসবুকের সাথে ছোট দেশে বড় ফোন কোম্পানি হ্যান্ডশেক করবে। আর আগের সেই গাধারা কিচ্ছুটি করতে পারেনি।
৩. মোবাইলে ফেসবুক বা অন্যান্য সাইট বাংলায় দেখা যায়না। গ্রামিনের এই প্রকল্প ম্যািজকের মাধ্যমে কারামতি করবে। কী করবে আল্লায়ই জানে!
৪. অনুবাদ করার জন্য ওমিক্রনল্যাব থেকে কেবল বাংলাফন্ট ডাউনলোড করে নিলেই নাকি হবে।
এতোই হালকাভাবে লিখিত যে সেগুলো নিয়ে চুলচেরা ব্যবচ্ছেদের দরকার নেই। যে বা যারা এই বিজ্ঞাপন তৈরি করেছেন। তারা এবং যারা প্রেস রিলিজ করেছেন প্রত্যেকেই হয় the lazy mind নয়তো the trifling, frivolous mind। কারণ তারা যে “prefers a great degree of ignorance to a small degree of trouble” করেন তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?
যাই হোক, এইবার এই শর্মার একটি প্রমান দেখেন: 
২০০৮ এর পর ২০০৯, ২০১০ চলে গেছে। তারমানে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে আমি অনুবাদ করি। অনুবাদক তালিকায় আমার বর্তমান অবস্থান সবার প্রথমে। কিন্তু সেই অবস্থানটি পেতে আমাকে প্রায় দীর্ঘ একবছরেরও বেশি প্রতিনিয়ত অনুবাদ করে যেতে হয়েছে। http://lenin9l.wordpress.com/2008/11/29/my-contribution-to-facebook-localization/ এধরণের পোস্ট মাঝে মাঝে দিতাম।
অনেক গল্প বলা হলো, আবার অনেক কিছুই বলা হলোনা। সবাই কষ্ট করে দেয়া লিংক থেকে অন্যান্য ব্লগে অন্যন্যদের লেখা পড়ে জানা-অজানার ফারাক ঘুঁচিয়ে নেবেন এই আশা করছি।





thanks for sharing!
ধন্যবাদ।
গ্রামীন ফোন কি চায় জানি না কিন্তু আমি তাদের উদ্যোগ সমর্থন করছি।
এটি আমার বাক্তিগত মতামত।
আমি তাদের উদ্যোগের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিকই তুলে ধরেছি যথাসম্ভব। মিথ্যা দিয়ে যার শুরু তার দ্বারা কতোটা মহতী কাজ হবে সেটা সন্দেহ থেকে যায়।
অনুবাদ কাজ ত মনে হয় প্রায় শেষের দিকে ছিল, গ্রামীন না আসলেও ক্ষতি কিছু হত না
হ্যাঁ অনুবাদের কাজ প্রায় শেষের পথেই ছিলো। আর এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ফেসবুকের মতো ডাইনামিক এবং বিশাল সাইটের অনুবাদ কখনোই নি:শেষে শেষ হবেনা বরং চলমান থাকবে। গ্রামীন দেখেছে যে এটির অনুবাদ প্রায় ৭৫% এর উপরে হয়ে আছে সুতরাং এটা ১০০% এর কাছে যেতে সময় লাগবেনা। আর ফেসবুকের মতো বিশাল জনপ্রিয় সাইটে বাংলার ক্রেডিটটা হাইজ্যাক করতে পারলে কেল্লাফতে।